নারায়ণগঞ্জ | | | | | বঙ্গাব্দ

জমি জমিই থেকে যায়, ফিরে আসে না স্বামী-সন্তান ১১ মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে শিউলির কান্না

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১০:০৮, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ইং
সংগৃহীত ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত
ad728
জমি জমিই থেকে যায়, ফিরে আসে না স্বামী-সন্তান ১১ মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে শিউলির কান্না

রিপোর্ট: নারায়ণগঞ্জ বাংলা নিউজ ডেস্ক 

‘জায়গাজমিন আইবো–যাইবো, স্বামী–সন্তান তো আর আইবো না। কথাটা বলার সময় শিউলি আক্তারের (২৫) কোলে ছিল ১১ মাস বয়সী ছোট্ট মেয়েটি। যে বয়সে একটি শিশুর বাবার কাঁধে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা, বড় বোনের সঙ্গে খেলার কথা, সেই বয়সেই তার মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে গেছে। বড় বোনটিও আর নেই।

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার দোসরপাড়া গ্রামের শিউলির জীবনে নেমে এসেছে একসঙ্গে দুই স্বজন হারানোর শোক। জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর স্বামী গোলাপ হোসেন (৩২) এবং চার বছর বয়সী মেয়ে তোয়াবা।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিরোধ নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে জায়গাজমি নিয়ে ঝগড়া, মারধর, মামলা এবং জমি দখলের অভিযোগ ছিল। গোলাপের পরিবার মনে করে, সেই বিরোধের জেরেই শেষ পর্যন্ত এমন ভয়াবহ পরিণতি হয়েছে।

ঘটনার দিন গোলাপ তাঁর চার বছরের মেয়ে তোয়াবাকে নিয়ে নিজের বাবার সঙ্গে দেখা করতে রামকৃষ্ণদী এলাকায় গিয়েছিলেন। তাঁর বাবা জয়নাল আবেদিন সেখানে একটি ইটভাটায় কাজ করতেন। সেখান থেকে মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন বাবা-মেয়ে।

অভিযোগ, হামলাকারীরা গোলাপকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। তাঁকে জোর করে বিষপান করানোর অভিযোগও উঠেছে। এ সময় ছোট্ট তোয়াবা বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সেদিন রাতে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মেয়েটিকে পাওয়া যায়নি। পরদিন সকালে রামকৃষ্ণদী এলাকার একটি পরিত্যক্ত জমির পাশে কাশবনে তার রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়া যায়। পরে গুরুতর আহত গোলাপকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও বৃহস্পতিবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

এই হত্যাকাণ্ডে নিহত গোলাপের বাবা জয়নাল আবেদিন বাদী হয়ে সিরাজদিখান থানায় মামলা করেছেন। মামলায় প্রতিবেশী সোহরাব বেপারীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। 

কুয়েতপ্রবাসী আমির হোসেনসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও ১২ থেকে ১৩ জনকেও আসামি করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান অভিযুক্ত সোহরাবকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্যদের সম্পৃক্ততা ও প্রকৃত কারণ তদন্তাধীন। তথ্যসূত্র দৈনিক প্রথম আলো

গোলাপ পেশায় ছিলেন দিনমজুর। বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হয়তো তাঁরও স্বপ্ন ছিল, একটু ভালোভাবে সংসার সাজাবেন, সন্তানদের বড় করবেন, স্ত্রীকে নিয়ে সুন্দর একটা জীবন কাটাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।

শুক্রবার সকালে স্বামীর রেখে যাওয়া ছোট্ট টিনের ঘরে বসে শিউলি যখন বিলাপ করছিলেন, তখন তাঁর সামনে পড়ে ছিল এক নির্মম বাস্তবতা। স্বামী নেই, বড় মেয়েটি নেই। কোলে শুধু ১১ মাসের একটি শিশু।

শিউলির কথার মধ্যে কোনো জটিল দর্শন নেই। নেই কোনো বড় বক্তব্য। আছে জীবনের সবচেয়ে কঠিন উপলব্ধি।

জমি নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে। সম্পত্তির ভাগ নিয়ে মামলা হতে পারে। কারও অধিকার কেউ কেড়ে নিলে তার বিচারও হওয়া উচিত। কিন্তু সেই বিরোধের নিষ্পত্তি কি মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে হবে?

এক টুকরো জমির জন্য একটি শিশুকে হত্যা করতে হবে, একজন বাবাকে প্রাণ দিতে হবে, একজন মাকে বাকি জীবন স্বামী-সন্তানের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে?

জমিজমা নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি আদালতে হওয়ার কথা। কারও অপরাধ থাকলে তার বিচার আইনে হওয়ার কথা। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিণতি যে কত ভয়াবহ হতে পারে, শিউলির জীবন এখন তার এক নির্মম উদাহরণ।

আমরা প্রায়ই সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলি। অথচ সম্পত্তির চেয়ে বড় যে উত্তরাধিকার, সেটি হলো সন্তানদের জন্য নিরাপদ একটি পৃথিবী রেখে যাওয়া।

শিউলির সেই পৃথিবীটুকুও ভেঙে গেছে।

এখন তাঁর একটাই দাবি হওয়া উচিত, স্বামী ও সন্তানকে যারা হত্যা করেছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হোক।

শেয়ার করুন