নারায়ণগঞ্জ | | | | | বঙ্গাব্দ

তিন প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে হাওরের বুকে অসহায়ত্ব জীবন যাপন পিতা মাতার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 26, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন:
ad728
তিন প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে হাওরের বুকে অসহায়ত্ব জীবন যাপন পিতা মাতার 

অনুসন্ধানী রিপোর্ট: নারায়ণগঞ্জ বাংলা নিউজ 
 
হাওরাঞ্চলের মেঠো পথ ধরে হেঁটে চললে চোখ পড়ে সাধারণ জীবনের ভিড়ে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ কিছু গল্পের ওপর। এমনই এক করুণ ও হৃদয়বিদারক বাস্তবরূপ দেখা গেছে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার চাকুয়া গ্রামে। 
যেখানে জন্মসূত্রে তিন প্রতিবন্ধী সন্তানকে কোলে-পিঠে আগলে রেখে এক চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন কাঠমিস্ত্রী স্বাধীন সূত্রধর ও তাঁর স্ত্রী শ্রীমতী সূত্রধর।

​তিনটি সন্তান— সনজীব সূত্রধর (১৮), সৃষ্টি সূত্রধর (১৫) ও সমাপ্ত সূত্রধর (১২)। বয়স বাড়ার সাথে সাথে যেখানে সন্তানদের বাবা-মায়ের সহায় হওয়ার কথা, সেখানে ভাগ্য যেন এক নির্মম পরিহাস লিখে রেখেছে এই দম্পতির জীবনে।
 জন্ম থেকেই তিন সন্তানের কেউ হাঁটতে পারে না, কেউবা নিজের স্বাভাবিক কাজগুলো করার সামর্থ্যটুকুও হারিয়ে বসে আছে।

​পরিবারের একমাত্র সদস্য স্বাধীন সূত্রধর পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রী। 
অন্যের ঘরে কাজের হাতুড়ি পিটিয়ে দিনশেষে যে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা উপার্জন হয়, তা দিয়ে বর্তমানের আকাশছোঁয়া বাজারদরে ৫ জনের খাবারের চাহিদা মেটানোর এক কঠিন লড়াই। তার ওপর সন্তানদের নিয়মিত ওষুধপত্র ও সুরক্ষার খরচ তো রয়েছেই।

বড় ছেলে সুস্থ থাকলে হয়তো বাবার কাঁধের বোঝা কিছুটা হালকা হতে পারত, কিন্তু অভাব আর ভাগ্যের নির্মমতায় সে স্বপ্ন পূরণ কখনো বাস্তবতায় রূপ নিবেনা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্বাধীন সূত্রধর আকুতি জানিয়ে বলেন,

"মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পাই, তা দিয়ে দুবেলা ডাল-ভাত জোগাড় করতেই হিমশিম খাই। সন্তানদের মুখে যে একটু পুষ্টিকর খাবার বা ওষুধ তুলে দেব, সেই সাধ্য আমার নেই।"

​অন্যদিকে, মা শ্রীমতী সূত্রধরের দিন কাটে এক অপরিসীম শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির মধ্যে।
 তিন সন্তানের গোসল, বাথরুম, খাওয়ানো থেকে শুরু করে ২৪ ঘণ্টার সার্বক্ষণিক দেখাশোনার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। চাইলেও তিনি ঘরের বাইরে গিয়ে উপার্জনের কোনো চেষ্টা করতে পারেন না। সন্তানদের এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করার উপায় নেই তাঁর।

​বর্তমানে বড় ছেলে ও ছোট মেয়েটি সরকারি ভাতা পেলেও ১৫ বছরের মেজো মেয়ে সৃষ্টি এখনো কোনো ভাতার আওতায় আসেনি। স্থানীয় ইউপি সদস্য সুনীল চন্দ্র দাস সৃষ্টির ভাতার জন্য আবেদন করার কথা জানিয়েছেন।

এছাড়া উপজেলা প্রশাসন ও জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে তিনটি হুইলচেয়ার এবং সৃষ্টির ভাতা চালুর আশ্বাস পাওয়া গেলেও, প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় অভাব আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে এই পরিবারটির দিন কাটছে গভীর এক হাহাকারে।

​হাওরের এক কোণে নীরবে জমা হওয়া এই অসহায়ত্ব কেবল একটি পরিবারের সংকট নয়, এটি আমাদের মানবিক বোধের কাছেও এক বড় প্রশ্ন। তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের অন্ন, চিকিৎসা আর সামান্য একটু সহানুভূতির খোঁজে আজ এক দিশেহারা বাবা-মায়ের করুণ প্রহর গোনা চলছে।
তাদের এই বেদনার দিনের সমাপ্তি কবে ঘটবে তা তাদের যানা নেই। হয়তো জীবনের শেষ লগ্নে এসে বাস্তবতার কাছে হার মানতে হবে এক দিন।

শেয়ার করুন